বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবুল খায়েরের স্মরণে- মীর জিল্লুর রহমান

0
31

মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক জীবদ্দশায় অসম্প্রদায়িক রাজনীতিক হিসাবে সমাজ পরিবর্তনের ও দূর্নীতি মুক্ত আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে বিল্পবী আদর্শের বীর সৈনিক রুপে স্বাক্ষর রেখে গেছেন তার আদর্শ ও জীবন আচারণে সকলকে উজ্জীবিত অনুপ্রাণিত করবে। একাত্তরের অকুতোভয় বীর সেনানী শেখ আবুল খায়ের জন্ম গ্রহন করেন ১৯৪৫ সালে তালা উপজেলার খেশরা ইউনিয়নের হরিহরনগর গ্রামে, পিতা- শেখ সুলতান আহম্মদ, মাতা- শহরজান বিবি, ৪ ভাই ও ২ বোন। আবুল খায়েরের ৫ পুত্র ও ২ কন্যা। পুত্রদের মধ্যে ২ জন চাকুরীরত ও একজন পুত্র লিটু তালা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের সভাপতির দায়িত্বে আছেন। শেখ আবুল খায়েরের হাতে খড়ি হরিহরনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে যশোর জেলাধীন কেশবপুর থানার একটি মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং সেখান থেকে তিনি ১৯৬৩ সালে এসএসসি সমমান পরীক্ষা পাশ করেন। তিনি সৎ আলাপী মিশুক মিষ্টভাষী ছিলেন। তিনি অন্যায়ের প্রতি সোচ্চার এবং ন্যায়ের পক্ষের একজন সাহসী মানুষ ছিলেন। তারপর তিনি বাড়িতে ফিরে এসে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উত্তাপ্ত হওয়ার কারনে আর অন্য কোথায়ও ভর্তি হওয়ার সুযোগ না পেয়ে তার সহদর ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবু জাফর কে সাথে নিয়ে ২ ভাই দেশ গড়ার কাজে মনোনিবেশ করেন। তাই ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ তথা শেখ মুজিবের পক্ষে প্রচার প্রচারনার জন্য নিজ এলাকাসহ পাশ্ববর্তী পাইকগাছা আশাশুনি, কালিগঞ্জ সহ বিভিন্ন এলাকায় বেরিয়ে পড়েন। অবশেষে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ নির্বাচনে জয়লাভ করে। তারপর পাক বাহিনীর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ৭ই মার্চের শেখ মুজিবের মুক্তিযুদ্ধের স্বাধীনতার ঘোষনা দিলে তাতে অনুপ্রানিত হয়ে এলাকায় তরুন ও সমবয়সীদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনের পক্ষে সংগঠিত করতে থাকেন। এক পর্যায়ের খুলনা জেলার পাইকগাছা থানার কাদাকাটির সংলগ্নে এলাকা থেকে পুলিশ থাকে গ্রেফতার করে পাইকগাছা থানায় নিয়ে যায়। অবশেষে এলাকার জনরোশের মুখে তাকে ঐ দিন সন্ধ্যায় থানা থেকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এলাকার লড়াকু সৈনিক আরও দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ব হন। যার ফলশ্রুতিতে তিনি ও তার ভাই আবু জাফর ভারতের টাকিতে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং এ অংশগ্রহন করেন। ট্রেনিং শেষে ফিরে এসে তালা উপজেলা মুজিব বাহিনীর প্রধান মোড়ল আব্দুস সালামের সাথে দেখা করেন। তারপর দিন এলাকায় ফিরে মাগুরা ইউনিয়নের প্রায়ত বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ সামছুর রহমান এর বাড়িতে মোড়ল আব্দুস সালাম এর সাথে এক গোপন আলোচনা সভায় বসেন। সেখানে স্থানীয় অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা উপস্থিত ছিলেন এবং সেখানে একটি মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে একটি মুক্তিযোদ্ধা টিম গঠন করা হয়। সেই টিমের প্রধান ছিলেন আবুল খায়ের এবং তৎকালীন সাতক্ষীরা মহাকুমার তালা থানার দক্ষিন পশ্চিম অঞ্চালের বাতুয়াডাঙ্গা গ্রামে একটি মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন হয়। সেখানে এই অঞ্চালের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ করানো হত। সেই ক্যাম্পের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন আবুল খায়ের। এক পর্যায়ে পাইকগাছা খড়িয়া বড়দাল, গরুইখালী, দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলে পাক বাহিনীর সাথে খন্ড খন্ড যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ হয়। সেখানে শেখ আবুল খায়ের এর সাহসী ভূমিকা ছিল। শেখ আবুল খায়ের এর ভাষ্য অনুযায়ী জানা যায় যে, তার জীবনের শেষ যুদ্ধ ছিল খুলনা জেলার পাইকগাছা থানার কপিলমুনি বিনোদ বিহারীর বাড়িতে রাজাকারদের সাথে। সেই যুদ্ধে ২০০ এর অধিক রাজাকার আতœসমর্পণ করে। সেখানে তার অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। ঐ দিন সন্ধ্যার পর কপিলমুনি থেকে তালা পর্যন্ত পায়ে এটে একটি বিজয় মিছিল নিয়ে তালায় প্রবেশ করেন আবুল খায়ের। সে সময় বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাঙালীর আদি খেলা কুস্তি লড়াই হতো। তিনি সে খেলায় অংশ নিয়ে বহুবার পুরস্কৃতি হয়েছেন তাছাড়া ফুটবল জগতে এই তালা পাইকগাছা অঞ্চলের এমন কোন মাঠ ছিল যেখানে আবুল খায়ের ফুটবল খেলা করেননি এবং বহু পুরস্কার জিতে নেছেন। এই বীর সেনানী চলে গেছেন না ফেরার পথে। ২৬ শে জুন ২০০১ সালে। তার সেই পদচলা চিরকালের মত থেমে গেছে। এদিকে প্রতি বছরই তার নিজস্ব বাস ভবনে মৃত্যু দিবস উপলক্ষ্যে মিলাদ মাহফিল ও দোয়া অনুষ্ঠান করা হয়। এবারও যথাসময়ে সেই দোয়া অনুষ্ঠান হবে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। তার মৃত্যুতে আমরা গভীর শোকাহত।

লেখক: মীর জিল্লুর রহমান
সভাপতি
মুক্তিযোদ্ধা মোড়ল আঃ সালাম ফাউন্ডেশন
তালা, সাতক্ষীরা।
মোবাঃ ০১৭২১-১৯৭৩২৯

মন্ত্যব্য সমূহ