কপোতাক্ষের কপিলমুনি কালীবাড়ী ঘাটে প্রতীমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হল দূর্গোৎসবের

0
66

আমাদের চীফ ফটো সাংবাদিক শেখ বিল্লাল হোসেনের ছবি ও তথ্যে রিপোর্ট করেছেন, শেখ নাদীর শাহ্::

ঐতিহ্যবাহী কপিলমুনির কপোতাক্ষের কালী বাড়ী ঘাটে অশ্রুশিক্ত নয়নে প্রতীমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হল শারদীয় দূর্গোৎসবের। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জনপদে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ব বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দূর্গাপূজা কেবল সনাতনীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনা। ধর্মীয় গন্ডি পেরিয়ে পর্বনপ্রিয় বাঙালি ধর্ম,বর্ণ নিবিশেষে সকলেই অংশ নেয় দূর্গোৎসবে।

দ্বাপর যুগের কপিলেশ্বর মুনির কপিলমুনির ঐতিহ্যবাহী কালীবাড়ী ঘাটে সেই স্মরণাতীত কাল থেকে দূর্গাপূজা হয়ে আসছে। ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত বিভিন্ন পূজা মন্ডপ কতৃপক্ষ ভিন্ন ভিন্ন আয়োজনে দূর্গোৎসব পালন করে। আয়োজনে ঐতিহ্যবাহী নানা পসরার ভীঁড়ে নাছিরপুরের সার্ব্বজনীন দূর্গা মন্ডপ প্রতিবারের ন্যায় এবারো আয়োজন করে এলাকা ও এলাকার বাইরের তারকাদের নিয়ে আলাদা আলাদা কনসার্ট। যা মূল আয়োজনের বাইরে বাড়তি আনন্দ দিতে সক্ষম হয়। তবে নবমীর শেষে শুভ বিজয়ার মঙ্গলবারের সকাল থেকে সনাতনী পূজারীদের পাশাপাশি সর্বস্তরের বাঙালিদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া।

এরপর দুপুরের পর থেকে ধর্মীয় অনুষ্ঠানিকতা শেষে জনপদের বিভিন্ন মন্ডপের প্রতীমা দর্শন ও দর্শন শেষে বিসর্জনের উদ্দেশ্যে নৌকায় উঠানো হয়।এরপর থেকেই মূলত শুরু হয় অন্য রকম শূণ্যতা। বেলা পড়ার সাথে সাথেই কপোতাক্ষের দু’ধারে দাঁড়ানো হাজার হাজার নারী শক্তি জাগরণে সনাতনী সধবাদের শেষ দর্শন ও সিঁদুর খেলায় মাতাতে প্রতীমাবাহী নৌকার সারি ঘুরে বেড়ায় কপোতাক্ষের বক্ষে। শুধু সনাতনী নয়,এ যেন চির চেনা বাঙালির এক অন্য রকম মিলন মেলা। এসময় দূরের কয়েকটি প্রতীমা আবার রাজপথে ব্যানে করেও ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।

অশ্রুসিক্ত নয়নে মাকে বিদায়

ধর্মীয় নানা সূত্র জানায়, দশমী তিথিতে শ্বশুরবাড়ি কৈলাসে পাড়ি দেন দেবী দুর্গা। বিষাদের সুরেই সেই দিনে বিজয়া পালন করেন মর্ত্যবাসী। পুরাণ মতে, মহিষাসুরের সঙ্গে ৯ দিন ও ৯ রাত্রি যুদ্ধ করার পর দশম দিনে জয় লাভ করেন দেবী দুর্গা। বিজয়া দশমী মূলত:সেই জয়কেই চিহ্নিত করে। এদিন একে অন্যকে মিষ্টিমুখের পাশাপাশি চলে কোলাকুলি।

পুরাণ মতে, অপরাজিতা আরাধনা দুর্গাপুজোরই অন্য অঙ্গ। কারণ, উমা তথা দুর্গার অন্য নামই নাকি অপরাজিতা। তবে এই দেবীর মূর্তি অন্যরকম। অপরাজিতা চতুর্ভূজা। হাতে শঙ্খ, চক্র, বর ও অভয়মুদ্রা শোভিত, ত্রিনয়না ও মাথায় চন্দ্রকলা সম্বলিত এই দেবী নীল বর্ণা বলে পুরাণে কথিত। দেবী দুর্গার বিসর্জনের পর পুজো মণ্ডপের ইশান কোণে অষ্টদল পদ্ম এঁকে অপরাজিতা লতা রেখে পুজো করা হয়। বিজয় দশমীতে সকল ভক্তকে ছেড়ে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দূর্গা চলে যাবেন, সনাতনী ধর্মীয় রীতি বা নিয়মানুযাী সেটাই স্বাভাবিক।

সর্বশেষ কপোতাক্ষের খুলনার পাইকগাছা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কপিলমুনি কালীবাড়ী ঘাটে প্রতীমা বিসর্জনের দৃশ্য ছিল সত্যিই নজর কাড়া। বিকেল ৫ টার পর থেকে কপোতাক্ষের বিভিন্ন প্রান্তের প্রতীমাবাহী নৌকাগুলো জড়ো হতে থাকে কালীবাড়ী ঘাটে। এসময় আগে থেকেই উপস্থিত হওয়া হাজার হাজার সনাতনীদের সরব উপস্থিতি স্থানীয় বাঙালি হুদয়কে নাড়া দেয় ভিন্ন আয়োজনে।

প্রতীমাদের পাশাপাশি সিঁদুরের রক্ত রাঙা সধবা মায়েদের রঙীণ মুখ গোটা পরিবেশকে করে তোলে আরো আনন্দমূখর। এসময় কপোতাক্ষের বুকে নৌকায় দুলতে থাকেন উৎসুক দর্শনার্থীরা। চলে সনাতনী মায়ের কপালে সিদুর দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা পর্ব। বিজয়া বিসর্জনে কালীবাড়ী ঘাটের আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন, কপিলমুনি ইউনিয়ন আ,লীগের সভাপতি যুগোল কিশোর দে, সাধারণ সম্পাদক শেখ ইকবাল হোসেন খোকন, খুলনা জেলা পুজা উদযাপন পরিষদের যুগ্ন সম্পাদক সাধন চন্দ্র ভদ্র, বিশিষ্ট সমাজ সেবক চম্পক পাল,বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী রাম প্রসাদ পাল ,কপিলমুনি প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জিএম আব্দুর রাজ্জাক রাজু,দীপ্ত নিউজের সাব এডিটর ও কানাইদিয়া পূর্বপাড়া হরিসভা মন্দিরের সভাপতি কালিদাশ অধিকারী,স্বপন সাহা,বেদ মন্দিরের সভাপতি রথিন দত্ত,বিধান চন্দ্র ভদ্র, সাংবাদিক তপন পাল,ইউপি সদস্য আজিজ বিশ্বাস, কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি আজমল হোসেন বাবু, ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান মোল্লা, মৎস্যজীবী লীগের সভাপতি প্রীতিষ মন্ডল,পবিত্র সাধু,রাম প্রসাদ সাধু প্রমুখ।

এদিকে বিজয়ার আনন্দে সকলে যখন উদ্বেলিত,ঠিক তখন নদীর পাশে দাঁড়িয়ে বিসর্জন পর্ব দেখতে আসা বয়োবৃদ্ধ সাংবাদিক অরুন বিশ্বাসের চোখে জল। সরেজমিনে দূর্গার বিসর্জন পর্ব দেখতে নদীর পাড়ে দাঁড়ানো আকষ্মিক আনন্দক্ষণে কান্নার কারণ জানতেই বলেন,এটা কোন বিষাদের ছাপ নয়,আনন্দের। জীবনের একেবারেই পড়ন্ত বেলায় দাঁড়িয়ে অন্তত চিরচেনা কপোতাক্ষের স্বরুপ চোখে পড়ছে। নাব্যতা হারিয়ে মরতে বসা কপোতাক্ষের বুকে ফের ভেসে বেড়াচ্ছে দেবীবাহী নৌকার দল। জানিনা আগামী বছর এমন করে মাকে দেখার সুযোগ হবে কিনা এমন নানা প্রলাপ করতে থাকেন, দৈনিক পূর্বাঞ্চলের বয়োবৃদ্ধ স্থানীয় সংবাদকর্মী অরুন কুমার বিশ্বাস।

মন্ত্যব্য সমূহ