মধ্যরাতে রাস্তায় পড়ে থাকা মস্তিষ্ক বিকৃত বৃদ্ধাকে উদ্ধার করে আপন ঠিকানায় পৌছে দিলেনর তালার কৃষি কর্মকর্তা

0
5

মানবিক মূল্যবোধ ও একটি ভাল কাজের মূল্যায়ন

 

রোকনুজ্জামান টিপু:::


আব্দুল্লাহ আল মামুন। সাতক্ষীরার তালা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমান ভয়াবহ করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও এলাকার কৃষক ও কৃষিকে বাঁচাতে রাত-দিন ছুটে চলা নিরলস মানুষটি এবার নিজের অজান্তেই জড়িয়ে ফেলেছেন মহান মানব সেবায়। মধ্য রাতে রাস্তায় পড়ে থাকা অজ্ঞাত পরিচয় সংজ্ঞাহীণ ৭০ বছরের এক বৃদ্ধাকে বহু কষ্টে উদ্ধার করে নিজ ঠিকানায় পৌছে দিয়ে রীতিমত সাড়া ফেলে দিয়েছেন।

১৪ মে’২০। ভোর ৫ টা থেকে মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর মানবিক সহায়তার উপকার ভোগীদের তালিকা যাচাই-বাছাই করণে টিম লিডার হিসেবে সদস্যদের নিয়ে মোটর সাইকেলযোগে কর্মস্থল তালায় ফেরার পথিমধ্যে জাতপুর। কর্মব্যস্ততায় কখনো মোবাইলে কল করা,আবার কখনো রিসিভ। এভাবে পথ চলতে খানিকটা বেখেয়ালীপনায় আকস্মিক একটি ট্রাক জমদূত হয়ে তার থেকে মাত্র ৫ফিটের মধ্যে চলে এসেছে। তবে রাখে আল্লাহ মারে কে! কিছুক্ষণ পর ট্রাক চলে গেলে নিজেকে আবিষ্কার করেন রাস্তার পাশে। তার ধারণা, স্বয়ং আল্লাহই তাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছেন। সেকেন্ডেই নিজের কর্ম ফলের মূল্যায়ন করে ফেলেন তিনি।

এরপর সারা দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে মোটর সাইকেলযোগে খুলনায় ফেরার পথিমধ্যে চুকনগর পার হয়ে প্রায় অর্ধ কি:মি: পরে। ঘড়ির কাটায় তখন রাত আনুমানিক সাড়ে ১০ টা। মনে হল, সামনে রাস্তার উপর কেউ কাত হয়ে শুয়ে আছে। ভাবছিলেন, কোন পাগল কিংবা নেশাখোর হবে হয়তো। খানিক দূর এগিয়ে অজানা কারণে ফের চলে আসেন শুয়ে থাকা মানুষটির কাছে। একজন বয়োবৃদ্ধা। বয়স ৭০ এর বেশী হবে হয়তো। পৃথিবীর সব ভয় উপেক্ষা করে বিবেকের প্রশ্ন, যেকোন ভাবে দাদীর বয়সী মানুষটাকে বাড়ী পৌছে দেয়া যায় কিনা! এক পর্যায়ে বৃদ্ধার কানের কাছে মাথা নিয়ে জানতে চান বাড়ী কোথায়? ঊারংবার জানতে চাওয়ায় অস্ফুট কন্ঠে সায় দিলেন,নিমাই-গোবিন্দ। পাল্টা প্রশ্ন,উনি কে? অনেকক্ষণ পর উত্তর,ভাই। একবার বলে ফেলেন,ব্রিজ। কৃষিকর্মকর্তার কাছে মনে হল, উনার বাড়ি সামনের খর্নিয়া ব্রীজের কাছে হবে হয়তো। বুড়ি মা’র থলি হাতড়ে কিছু পয়সা ও একটি কলা ছিলো। খেতে বলে খাওয়াতে গিয়েও পারলেননা। এবার ভাবলেন, সহযোগী হিসেবে একজন হেলপার দরকার। ভাবতেই সামনের ক্ষেতের আইলে টর্চধারী এক অজ্ঞাত পরিচয় দেখে দৌড়ে সামনে গিয়ে সাহায্য প্রার্থনা করলে কাছে বুড়ির শরীরে টর্চ ধরে না বোধক সাড়া। করোনা মৌসুমে তিনি কাউকে ধরে সহায়তা করতে পারবেননা জানিয়ে চলে গেলেন। অনেকের কাছে ফোন করেও কোন সহায়তা মিললনা। আল্লাহর রহমতে একটি ভ্যান আসলো। চালকের চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ। তারপরও বুড়িকে নিয়ে খর্নিয়া পৌছাতে রাজী হলেন।

৩ জন ধরাধরি করে বৃদ্ধাকে ভ্যানে উঠিয়ে পিছু নেন তিনি। বৃদ্ধা তখন কষ্ঠে কাতরাচ্ছিলেন। তবে ভ্যান ওয়ালা ছাড়া অন্য কোন লোক না থাকায় আরেক জনের অপেক্ষায় তাকে কিছুক্ষণ দাঁড়াতে বলায় অনেক রাগারগির পরও থেকে যান তিনি। পর্যায়ক্রমে অনেকের কাছে সহযোগিতা চেয়ে না পেলেও পরে জানাগেল, বৃদ্ধার ভাই নিমাই গোবিন্দ পাশের ওয়ার্ডের প্রভাবশালী ইউপি সদস্য। এবার ভ্যানযোগে বৃদ্ধাকে নিয়ে নিমাই গোবিন্দ’র বাড়ির পথে চলা। একসময় কাংখিত বাড়ীতে পৌছালেও কারোর দেখা মিলছিলনা। ডাকচিৎকারের একপর্যায়ে জনৈক যুবক বেরিয়ে এসে জানান দিলেন, বৃদ্ধা তার পিশী। নিমাই তার কাকা। তিনি কোথায় জানতে চাইলে বলেন,ত্রাণ দিতে গেছেন এখনো ফেরেননি।
কৃষি কর্মকর্তার ভাবনায়, ভাই জনসেবায় বেরিয়েছেন আর ৭০ বছরের বৃদ্ধা বোন রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন! প্রতিবেশীরা জানালেন, বহু আগে বৃদ্ধার কোল হতে উনার বাচ্চাকে কেড়ে নিয়ে কারা যেন হত্যা করেছিলো। সেই থেকে বৃদ্ধা পাগলিনী। ঘটনার পর থেকে তার স্বামীসহ ভাইবোন কিংবা স্বজনদের কেউ উনাকে কোন দেখাশুনা করেনা বরং বোঝা মনে করেন।

বিচিত্র পৃথিবীর বিচিত্র মানুষের বিচিত্র সব মানষিকতা! মন খারাপ হয়ে গেল কৃষি কর্তাসহ অগন্তুকদের। ভাবনায়,বৃদ্ধাকে একা অসহায় অবস্থায় ফেলে পাষন্ডরা রাতে ঘুমায় কিভাবে? রাস্তা থেকে মৃত্যুপথযাত্রী বয়োবৃদ্ধাকে তার আপন ঠিকানায় পৌছে দিতে প্রধান সহায়তাকারী ভ্যানচালকের নাম ঠিকানা নিয়ে জোরপূর্বক তাকে ৫ শ’টাকা গুঁজে দিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান দিলেও সেই রাতে বৃদ্ধার ভাই জনদরদী নিমাই-গোবিন্দ মেম্বরের সাথে দেখা হয়নি কর্মকর্তার। ভবিষ্যতে বৃদ্ধার খোঁজ খবর নেয়া ও অন্তত মেম্বরের সাথে একটি বারের জন্য দেখা করার মানষিকতায় আবার গন্তব্যের পথে বেরিয়ে পড়েন কৃষি ও কৃষকের ভাল খবরের ফেরীওয়ালা।

এদিকে কৃষি কর্মকর্তার ক্ষেত-খামারের নিরীক্ষণের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধের খবরে তালা অফিস পাড়া থেকে শুরু করে তৃণমূলের কৃষি পাড়ায় মহামারি করোনা আতংকের মধ্যেও আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

এব্যাপারে কৃষিকর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,মানবিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে নিজের নিয়মিত কর্মকান্ডের অংশ হিসেবেই বৃদ্ধাকে তার আপন ঠিকানায় পৌছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন তিনি। তবে সারা দিনের কর্মব্যস্ততা, প্রধানমন্ত্রীর মানবিক সহায়তায় উপকারভোগীদের তালিকা যাচাই ও নিজের সড়ক দূর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে যাওয়াকে বৃদ্ধার ঘরে ফেরার সাথেও মূল্যায়ন করেন তিনি।

মন্ত্যব্য সমূহ