হেপাটাইটিস সি আবিষ্কার, চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত

0
10

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এবার নোবেল পুরস্কারটি তিনজন বিজ্ঞানীকে দেয়া হয়েছে। তারা রক্তবাহিত হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ভাইরাসটি সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের প্রধান কারণ।

হেপাটাইটিস সি ভাইরাস শনাক্তকরণে নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভি জে অলটার ও চার্লস এম রাইস এবং ব্রিটেনের মাইকেল হাউটনের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাদের কাজ শুরুর আগেই শনাক্ত হয় হেপাটাইটিস এ এবং বি।  এবার সি ভাইরাস আবিষ্কারটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে রক্তবাহিত হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে গবেষকদের আগে কোনো ধারণাই ছিল না। হেপাটাইটিস সি ভাইরাস আবিষ্কারের ফলে দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিসের বাকি ঘটনাগুলোর কারণ উন্মোচন হয়েছে।

হেপাটাইটিস কী এবং এটা মানবস্বাস্থ্যের জন্য কতটা হুমকি?

হেপাটাইটিস মূলত ভাইরাল সংক্রমণের কারণে ঘটে। এর কারণ হিসেবে বলা যায়, অ্যালকোহলের অপব্যবহার, পরিবেশ থেকে বিষ সংক্রমণ এবং অটোইমিউন রোগ। গেল শতাব্দীর চল্লিশের দশকে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে প্রধানত দুটি সংক্রামক হেপাটাইটিস রয়েছে। হেপাটাইটিস এ দূষিত পানি বা খাবার থেকে সংক্রমিত হয়। সাধারণত রোগীর ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকে। রক্ত ​​এবং শারীরিক তরলগুলোর মাধ্যমে সংক্রমিত হয় হেপাটাইটিস বি। এটি আরো অনেক গুরুতর হুমকি মানব শরীরের জন্য। কারণ, এতে রয়েছে সিরোসিস এবং লিভার ক্যান্সারের বিকাশ ঘটা বা এর দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা। হেপাটাইটিসের এই ধরনটি মারাত্মক, কারণ অন্য কোনো গুরুতর জটিলতা দেখা দেওয়ার আগে সুস্থ ব্যক্তি বহু বছর নিঃশব্দে সংক্রমিত হতে পারেন। রক্তবাহিত হেপাটাইটিস উল্লেখযোগ্যভাবে রোগব্যাধি এবং মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত এবং বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর ১০ লাখের বেশি মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এইভাবে এইচআইভি সংক্রমণ এবং যক্ষ্মার সঙ্গে তুলনীয় পর্যায়ে এটি বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যের জন্য  উদ্বেগ তৈরি করেছে।

হেপাটাইটিস সি ভাইরাস শনাক্তকরণ

গবেষণার শুরুতে নভেল ভাইরাস শনাক্ত করা ছিল সর্বাধিক অগ্রাধিকারযোগ্য। ভাইরাসটির জিনোম সিকোয়েন্স বিচ্ছিন্নকরণের জন্য সমস্ত প্রথাগত কৌশল ব্যবহার সত্ত্বেও এক দশকের বেশি সময় ধরে নিরবচ্ছিন্ন অবস্থায় নির্লিপ্ত ছিল। ফার্মাসিউটিক্যাল ফার্ম চিরনের পক্ষে কাজ করা মাইকেল হুটন ভাইরাসটির জেনেটিক ক্রম বিচ্ছিন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি এবং তার সহকর্মীরা সংক্রমিত শিম্পাঞ্জির রক্তে পাওয়া নিউক্লিক অ্যাসিড থেকে ডিএনএ খণ্ডগুলো সংগ্রহ করেন। এই খণ্ডগুলোর বেশির ভাগই শিম্পাঞ্জির জিনোম থেকে এসেছিল। ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডিগুলো হেপাটাইটিস রোগীদের থেকে নেওয়া রক্তে উপস্থিত থাকবে- এ রকম ধারণার ভিত্তিতে গবেষক ও বিশ্লেষকরা ভাইরাল প্রোটিনকে সন্ধান করে ক্লোনযুক্ত ভাইরাল ডিএনএ খণ্ডগুলো শনাক্ত করতে রোগীর সেরামকে ব্যবহার করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানের পরে একটি ইতিবাচক ক্লোন পাওয়া যায়। আরো বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা যায় যে, এই ক্লোনটি ফ্ল্যাভিভাইরাস পরিবারভুক্ত একটি নভেল আরএনএ ভাইরাস থেকে উদ্ভূত হয়েছিল। এর নামকরণ করা হয় ‘হেপাটাইটিস সি’ ভাইরাস। দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস রোগীদের অ্যান্টিবডিগুলোর উপস্থিতি এই ভাইরাসকে মিসিং লিঙ্ক (অব্যক্ত ক্ষেত্র) হিসেবে নিশ্চিত করে।

হেপাটাইটিস সি ভাইরাস আবিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত ছিল, তবে ধাঁধার একটি প্রয়োজনীয় অংশ অনুপস্থিত থেকে যায়: ভাইরাসটি কি একা হেপাটাইটিস ঘটাতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য বিজ্ঞানীদের তদন্ত করতে হয়েছিল যে ক্লোন করা ভাইরাসটি রোগ প্রতিরূপণ করতে এবং রোগের কারণ হতে পারে কি না। সেন্ট লুইসের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক চার্লস এম রাইস ও অন্যরা আরএনএ ভাইরাস নিয়ে কাজ করতে গিয়ে হেপাটাইটিস সি জিনোমের শেষে একটি অসংজ্ঞায়িত অঞ্চল উল্লেখ করেছিলেন এবং তাদের সন্দেহ ছিল এটি ভাইরাস প্রতিরূপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তিনি পৃথক পৃথক ভাইরাসের নমুনায় জিনগত পরিবর্তনগুলোও পর্যবেক্ষণ করে এবং অনুমান করেন যে, তাদের মধ্যে কিছু ভাইরাস বাধা সৃষ্টি করতে পারে। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে গবেষণা করে রাইস হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের একটি আরএনএ তৈরি করেন। এটি ভাইরাল জিনোমের নতুন সংজ্ঞা নিরূপণ করে এবং জেনেটিক বিকল্প নিষ্ক্রিয় করে তোলে। এই আরএনএটি যখন শিম্পাঞ্জির যকৃতে ইনজেকশন করা হয়েছিল, তখন রক্তে ভাইরাস শনাক্ত করা যায় এবং মানুষের মধ্যে দেখা দীর্ঘস্থায়ী রোগের পরিবর্তনগুলো লক্ষ করা যায়। এটিই চূড়ান্ত প্রমাণ যে একমাত্র হেপাটাইটিস সি ভাইরাস, হেপাটাইটিসের অব্যক্ত ক্ষেত্র হতে পারে।

এই নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তি ও আবিষ্কারের তাৎপর্য

হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের আবিষ্কার ভাইরাল রোগের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের একটি যুগান্তকারী অর্জন। ভাইরাসটির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল রক্ত ​​পরীক্ষা এখন উপলভ্য এবং এগুলো বিশ্বের বেশির ভাগ অংশে ট্রান্সফিউশন-পরবর্তী হেপাটাইটিসকে মূলত নির্মূল করে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যের ব্যাপক উন্নতি করেছে। তাদের আবিষ্কারের ফলে হেপাটাইটিস সি-তে নির্দেশিত অ্যান্টিভাইরাল ওষুধগুলোর দ্রুত বিকাশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো। এই রোগটি এখন নিরাময় করা যাবে। বিশ্ব থেকে হেপাটাইটিস সি ভাইরাস নির্মূল করার আশা বাড়িয়ে তোলে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিশ্বজুড়ে রক্ত ​​পরীক্ষা এবং অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ সরবরাহ করার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন হবে।

মন্ত্যব্য সমূহ